দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

শরীয়তপুরের জাজিরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহতের পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর অন্তত দুই দফায় প্রতিপক্ষের অর্ধশত বাড়িঘরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। লুট করে নেওয়া হয়েছে গবাদিপশু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা। এমনকি কয়েকটি পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবিরও অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তমিজ খাঁর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার সন্ধ্যায় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় অন্তত শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একজনের হাতের কবজি উড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্তত ১০ জন আহত হন। ঘটনাস্থলে ককটেল বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান ৭০ বছর বয়সী মান্নান সরদার।
মান্নান সরদারের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে দিদার সরদার বাদী হয়ে বুধবার জাজিরা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ওই মামলার এজাহারভুক্ত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। তবে মামলা হওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বুধবার দিনগত রাতে রেজাউল শিকদারের নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ ফারুক চৌকিদার, ইউনূস আলী চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, লিটন চৌকিদার, মনরজান বিবি, আজহার চৌকিদার, ওয়াসিম চৌকিদার, উকিল চৌকিদার, জসিম চৌকিদার, বাচ্চু চৌকিদার, শাহজাহান চৌকিদার, রাজ্জাক মাদবর, নূরুল আমিন মাদবর, মোশাররফ চৌদাদারসহ অর্ধশত বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
ভাঙচুর করা হয় ঘরের দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র। এমনকি কয়েকটি ভবনের ছাদও ফুটো করে দেওয়া হয়। বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। এরপর চলে লুটপাট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাড়িঘর থেকে গরু-বাছুর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদাও দাবি করা হয়েছে।
চর গজনাইপুর এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী উকিল চৌকিদারের বাড়িতেও বোমা বিস্ফোরণের পর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর স্ত্রী রুবিনা আক্তারের দাবি, প্রতিপক্ষের রেজাউল শিকদার তাঁদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁদের বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়।
ভুক্তভোগী সুমি বেগম বলেন, সেদিন মারামারি হয়েছে চরধুপুর এলাকায়। তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন, তিনি মারামারিতে অংশ নেননি। এরপরও রেজাউল শিকদার এসে ঘরপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাতে তাঁদের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
জসিম চৌকিদারের স্ত্রী শিমুলি বেগম অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী লাউখোলা বাজারে ব্যবসা করেন এবং মারামারিতে যাননি। এরপরও তাঁকে আসামি করা হয়েছে। বুধবার রাতে রেজাউল শিকদারের নেতৃত্বে তাঁদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে দুটি গরু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে। ভয়ভীতি দেখাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে তাঁরা জীবন বাঁচাতে চরে গিয়ে আশ্রয় নেন।
বোমা বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যুর পর প্রতিশোধের আগুনে রেহাই পায়নি অনেক নিরপরাধ মানুষের বসতবাড়িও। অভিযোগ উঠেছে, সংঘর্ষে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও হামলা চালিয়ে তাঁদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুমি আক্তার নামের এক গৃহবধূ বলেন, তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন। তাঁরা মারামারির বিষয়ে কিছুই জানেন না। এরপরও তাঁর ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। ঘরের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। এখন ঘরে থাকা কিংবা রান্না করে খাওয়ার মতো অবস্থাও নেই। তিনি ঘটনার তদন্ত করে সংঘর্ষে জড়িতদের পাশাপাশি তাঁদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটকারীদেরও বিচার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
সচেতন নাগরিক ইমরান আল নাজির বলেন, একজন মানুষ মারা গেছে, সেখানে একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অন্যদিকে নিহতের পক্ষের লোকজন যদি প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, সেটিও আরেকটি অপরাধ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যারা মামলা-বাণিজ্য ও লুটপাট করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
তবে লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেজাউল শিকদার। তিনি বলেন, তাঁর জানামতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাঁরা নিজেরাই মালামাল সরিয়ে নিয়ে এখন তাঁদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।
এদিকে হত্যা মামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি লুটপাট ও হামলা প্রতিহত করতেও তৎপর রয়েছে তারা। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, নিহতের ঘটনায় তাঁর ছেলে বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ধরনের ঘটনার পর প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য পুলিশ তা প্রতিহতের চেষ্টা করছে। বুধবার রাতে বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেএম